![]() |
| লোভের ফাঁদ থেকে মুক্তি |
শিরোনাম: "আবার ফিরে দাঁড়ানোর গল্প"
যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে কিছু দূরে ছায়াঘেরা একটি গলিতে রিয়াদ তার মা-বাবা ও ছোট বোনের সাথে সুখে থাকত। রিয়াদের বাবা একটি ছোট মুদি দোকান চালাতেন, আর মা সেলাইয়ের কাজ করে বাড়তি আয় করতেন। রিয়াদ কলেজের শেষ বছরে পড়ে এবং ফ্রিল্যান্স গ্রাফিক ডিজাইনার হিসেবে কাজ করত। তার স্বপ্ন ছিল পরিবারের জন্য একটি বড় বাড়ি কেনা এবং ছোট বোনটিকে ভালো করে লেখাপড়া করানো। সে সবাইকে সাহায্য করত—পাড়ার গরিব শিশুদের টিউশন পড়াত, বৃদ্ধদের বাজার থেকে জিনিসপত্র এনে দিত। সবাই তাকে ভালোবাসত, "ভালো ছেলে রিয়াদ" ডাকনামেই ডাকত।
ঝলকে আসা বিপদ
একদিন রিয়াদের দাঁতে অসহ্য ব্যথা উঠল। পাড়ার ডেন্টিস্ট ডা. শিহাবের ক্লিনিকে গেল সে। চিকিৎসার ফাঁকে ডা. শিহাব গল্প জুড়ে দিলেন—তিনি শুধু দাঁতের ডাক্তার নন, ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ফরেক্স ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে মাসে লাখো টাকা আয় করেন! "এখন তো অনলাইনেই পৃথিবী, বাবা! ঝুঁকি নিতে জানলে জীবন বদলে যায়," বললেন তিনি চকচকে স্মার্টফোনে তার ট্রেডিং অ্যাপ দেখিয়ে। রিয়াদের চোখে জ্বলল নতুন স্বপ্ন। ডাক্তারের পরামর্শে সে "গোল্ডেন ট্রেডার্স" নামে একটি প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ শুরু করল। প্রথম মাসেই ৫০% লাভ! সে বাবার সঞ্চয়, মায়ের গহনা বেচে, এমনকি বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার করে ক্রমাগত ইনভেস্ট করতে থাকল।
পতন
কিন্তু এক সকালে "গোল্ডেন ট্রেডার্স" ওয়েবসাইট অদৃশ্য হয়ে গেল। ডা. শিহাবের ফোনও বন্ধ। রিয়াদের ১২ লাখ টাকা উধাও। পরিবারের সমস্ত সঞ্চয় শূন্যে মিশে গেল। বাবা হাসপাতালে চলে গেলেন স্ট্রোকে, মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, ছোট বোনের স্কুল ফি বন্ধ হতে চলল। পাড়ার লোকজন, যাদের সে একদিন সাহায্য করত, তারা এখন পিঠ চাপড়ে বলত, "লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু!" রিয়াদ নিজেকে একা মনে করল—সবাইকে ঠকানো সেই টাকা দিয়ে সে তো স্বপ্ন দেখেছিল পরিবারকে উদ্ধার করার!
অন্ধকারে আলোর সন্ধান
একদিন ভোরে রিয়াদ নদীর পাড়ে বসে ছিল। হঠাৎ পিছু ডাক শুনে ঘুরে দেখল—পড়শি ফরিদা আপা, যার ছেলেকে সে বিনামূল্যে পড়াত। ফরিদা আপা তার হাত ধরে বললেন, "তুই আমাদের ছেলের জীবন বদলে দিয়েছিলি। আজ তোর মা-বাবার মুখে অন্ন দেবার দায়িত্ব নিলাম আমরা। তুই শুধু উঠে দাঁড়া।" সেই দিন রিয়াদ প্রথম কেঁদেছিল মাসখানেক পর। পাড়ার মানুষজন, যারা তার কাছ থেকে সাহায্য পেয়েছিল, তারা একে একে এগিয়ে এলো—কেউ বাবার চিকিৎসার টাকা দিল, কেউ রিয়াদকে নতুন করে কাজ খুঁজে দিতে সাহায্য করল।
নতুন যাত্রা
রিয়াদ ফিরে এল গ্রাফিক ডিজাইনিংয়ে। এবার সে শিখল কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের দক্ষতা বিক্রি করতে হয়। এক বছর পর সে স্থানীয় যুবকদের জন্য "ডিজিটাল স্কিলস্ ফর অল" নামে একটি ফ্রি ওয়ার্কশপ শুরু করল। তার গল্প শুনে ডা. শিহাবের শিকার আরও কয়েকজন যুবক যোগ দিল এই উদ্যোগে। আজ রিয়াদের টিম শেখায়—কীভাবে ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, এবং নিরাপদ বিনিয়োগ করতে হয়। পাশাপাশি, সে স্থানীয় এনজিওর সাথে কাজ করে স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে।
পরিণতি
বাবার দোকান আবার চালু হয়েছে, ছোট বোন এখন মেডিকেলে পড়ে। রিয়াদের ওয়ার্কশপে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক যুবক আজ আত্মনির্ভর। ডা. শিহাবকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও রিয়াদ এখন বিশ্বাস করে, "ক্ষমা করাই সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ।" তার মুখে আবার হাসি ফিরেছে—না, সেটা আগের সেই উচ্ছ্বসিত হাসি নয়, বরং সংগ্রামে পোড়া, পরিপক্ব এক জয়ী হাসি। সে জানে, জীবন তাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, তা দিয়েই সে এখন অন্যদের ঝড় থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। কারো জীবন থেকে কেড়ে নিলে টাকা, ফেরত দাও স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন—এটাই রিয়াদের নতুন মন্ত্র।



1 মন্তব্যসমূহ
Omg bro
উত্তরমুছুন